অবকাঠামো অর্থায়নের নতুন পথ

মনোরেল ও পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ গত এক দশকে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়নের পথে অগ্রসরশীল ছিল—সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও মহাসড়ক।

সব মিলিয়ে উন্নয়নের গতি দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু এ অগ্রযাত্রা দেশের আর্থিক অবস্থার ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। বাজেট ঘাটতি পূরণ, ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করেই অধিকাংশ বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং মূলধন পাচারের প্রভাবও সুস্পষ্ট। ফলে নতুন বড় প্রকল্পে আগের মতো সরকারি ও ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন চালিয়ে নেয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এ প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত মনোরেল প্রকল্পটি শুধু একটি পরিবহন উদ্যোগ নয়, এটি অর্থায়নের নতুন পথ অনুধাবন করার সুযোগ। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত এ মনোরেল ঢাকার বিদ্যমান মেট্রো নেটওয়ার্ককে সম্পূরক করবে। এটি তুলনামূলক দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এবং ব্যয়ও তুলনামূলক কম। নগর যানজট নিরসনের পাশাপাশি এটি অবকাঠামো অর্থায়নের বিকল্প কাঠামো পরীক্ষার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।

আঞ্চলিক অনুরূপ প্রকল্পের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, ২১-২২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মনোরেলের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় এ অংক উল্লেখযোগ্য। তবে পুরো অর্থ সরকারি তহবিল থেকে না তুলে এর একটি অংশ পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব। যদি মোট অর্থের ৩০ শতাংশ, প্রায় ২৪০ মিলিয়ন ডলার পুঁজিবাজারের মাধ্যমে তোলা যায়, তবে সরকারের বাজেট বরাদ্দের চাপ অনেকটাই সহনীয় হবে।

এক্ষেত্রে একটি যৌক্তিক অনুমান হতে পারে ৮০ শতাংশ করপোরেট বন্ড এবং ২০ শতাংশ শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ। কনভার্টিবল বন্ডের মতো মাধ্যম ব্যবহার করলে প্রাথমিক পর্যায়ে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায় এবং প্রকল্প চালু হওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা শেয়ারে রূপান্তরের সুযোগ পান। পাশাপাশি প্রকল্প কোম্পানির আংশিক শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো সম্পদে অংশ নিতে পারবেন। নির্মাণ পর্যায়ে সীমিত সরকারি গ্যারান্টি দেয়া হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।

তবে বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো এমন বড় অর্থ সংগ্রহের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। করপোরেট বন্ড বাজার এখনো অনুন্নত, আর শেয়ারবাজারের দৈনিক লেনদেনও সীমিত। এটি সাময়িক সমস্যা নয়; দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। দীর্ঘ আইপিও স্থবিরতা, জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া, ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের আধিপত্য, সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক সক্রিয়তা ও নতুন পণ্যের অভাব—সব মিলিয়ে বাজারের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব, যদি সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক সংস্কার করা হয়। তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর ব্যবধান বাড়ালে বাজারে আসার প্রণোদনা তৈরি হবে। লভ্যাংশে করছাড় ও পুঁজিবাজার বিনিয়োগে কর রিবেট বাড়ালে ব্যাংক ডিপোজিটের বাইরে এসে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়বে। একই সঙ্গে আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, তথ্যপ্রকাশ ডিজিটাল করা এবং সবুজ বন্ড, সুকুক বা সাসটেইনেবিলিটি বন্ডের মতো নতুন পণ্য চালু করা জরুরি।

বীমা খাত ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আংশিক তালিকাভুক্তি এবং বিদেশী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে আনা গেলে বাজারের গভীরতা বাড়বে। পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মুনাফা প্রত্যাবাসন সহজ করা এবং নিয়ন্ত্রিত শর্ট সেলিং চালু করলে তারল্য ও আস্থা উভয়ই বাড়বে।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে আছে। আগের মতো শুধু ঋণের ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ আরো বাড়বে। অন্যদিকে, মনোরেলের মতো গতিশীল উদ্যোগ পুঁজিবাজারকে যুক্ত করতে পারলে তা হবে দ্বিমুখী অর্জন, যা একদিকে অবকাঠামোর উন্নয়ন, অন্যদিকে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত শক্তিশালীকরণ।

সঠিক নীতি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া গেলে তিন-চার বছরের মধ্যেই পুঁজিবাজার বৃহৎ অবকাঠামো অর্থায়নের একটি কার্যকর প্লাটফর্মে পরিণত হতে পারে। এ ধরনের কাঠামোবদ্ধ ও সরকারি গ্যারান্টিপ্রাপ্ত প্রজেক্ট পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং তাদের অংশগ্রহণও বাড়বে। সেই অর্থে মনোরেল কেবল একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের ঋণনির্ভর উন্নয়ন মডেল থেকে পুঁজিবাজারভিত্তিক, টেকসই অর্থায়নের পথে এক কৌশলগত পদক্ষেপ।

ওয়াকার আহমেদ চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড

আরও